Advertisement

Responsive Advertisement

সাগরে ভেসে ৬ দিন—খাবার-পানির অভাবে মৃত্যু ১৮ জনের, সুনামগঞ্জের ১০ জনের পরিচয় নিশ্চিত

 

লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে মর্মান্তিক মৃত্যু: সুনামগঞ্জের ১০ জনসহ প্রাণ হারালেন ১৮ অভিবাসী

ভূমধ্যসাগরের বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিতে গিয়ে আবারও ঘটলো হৃদয়বিদারক এক মানবিক বিপর্যয়। লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে তীব্র খাদ্য ও পানির সংকটে অন্তত ১৮ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে, যাদের সবার বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়।


ঘটনাটি ঘটেছে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে, যখন দালাল চক্রের মাধ্যমে একটি রাবারের ছোট নৌকায় করে ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তারা। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নৌকাটি প্রায় ছয় দিন সাগরে ভাসতে থাকে। এই দীর্ঘ সময় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে একে একে অসুস্থ হয়ে পড়েন যাত্রীরা, এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটে অনেকের।

মৃতদের পরিচয় নিশ্চিত

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বজনদের মাধ্যমে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলার ১০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। তাদের মধ্যে দিরাই উপজেলার চারজন হলেন:

  • নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০)
  • সাজিদুর রহমান (২৮)
  • সাহান এহিয়া (২৫)
  • মুজিবুর রহমান (৩৮)

এছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের আবু ফাহিম এবং জগন্নাথপুর উপজেলার:

  • সোহানুর রহমান
  • শায়ক আহমেদ
  • মো. নাঈম
  • আমিনুর রহমান
  • মোহাম্মদ আলী

এর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

দালাল চক্রের ফাঁদে পড়া স্বপ্নযাত্রা

স্বজনদের বরাতে জানা যায়, উন্নত জীবনের আশায় দালালদের সঙ্গে প্রায় ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে তারা দেশ ছেড়েছিলেন। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর চুক্তির অর্ধেক অর্থ পরিশোধ করা হয়। এরপরই শুরু হয় অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা।

পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েকদিন ধরে তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। পরে গ্রিসে অবস্থানরত স্বজনদের মাধ্যমে মৃত্যুর খবর পান তারা, যা পুরো পরিবারকে শোকে স্তব্ধ করে দেয়।

উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের বর্ণনায় ভয়াবহতা

গ্রিসে অবস্থানরত হবিগঞ্জের এক যুবক, যিনি একইভাবে ৬ মার্চ সেখানে পৌঁছেছেন, জানান—২৭ মার্চ সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বর্তমানে একটি শরণার্থী ক্যাম্পে রাখা হয়েছে।

উদ্ধারকৃতদের বরাতে তিনি জানান, নৌকাটি মাঝপথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। খাবার ও পানির মজুদ দ্রুত শেষ হয়ে যায়। অনেকেই পানিশূন্যতা ও দুর্বলতায় অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে যে, যারা মারা যান, তাদের মরদেহ সাগরেই ফেলে দিতে বাধ্য হন জীবিতরা—যা এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডির প্রতিচ্ছবি।

আহত ও অসুস্থদের অবস্থা

উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের মধ্যে অন্তত দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিরা গ্রিসের একটি ক্যাম্পে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং শারীরিকভাবে দুর্বল অবস্থায় আছেন।

প্রশাসনের বক্তব্য

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার জানিয়েছেন, বিভিন্ন মাধ্যমে ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, “ভুক্তভোগীদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত করতে এবং পুরো ঘটনার বিস্তারিত জানতে পুলিশ কাজ করছে। দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও তদন্ত চলছে।”

মানবপাচার ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন—এক চলমান সংকট

বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা নতুন নয়। প্রতি বছর বহু মানুষ দালালদের প্রলোভনে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ বেছে নিচ্ছেন। অনেকেই গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে প্রাণ হারাচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার অভাব, দারিদ্র্য এবং উন্নত জীবনের আশাই মানুষকে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই যাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে উঠছে মৃত্যুর ফাঁদ।

শেষ কথা

এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রমাণ করলো—অবৈধ পথে বিদেশ যাত্রা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। একটি স্বপ্নের জন্য কতগুলো প্রাণ ঝরে গেল, কতগুলো পরিবার চিরতরে ভেঙে গেল—তার হিসাব হয়তো কখনোই পূরণ হবে না।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই পারে এমন মৃত্যুমিছিল থামাতে।

Post a Comment

0 Comments