বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছে। দেশের মোট বিদেশি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের শেষ তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) দেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। এর আগে সেপ্টেম্বর শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ১০৩ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় ১৮ মাসে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
📊 কেন বাড়ছে বিদেশি ঋণ?
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত কয়েক বছরে বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ব্যাপক হারে বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল, নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ।
এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সরকারের প্রথম বছরেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়।
💰 ডলার সংকট ও অর্থনীতির চাপ
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের ডলার বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এর দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছায়।
এর ফলে দেশে আমদানি ব্যয় বেড়ে যায় এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে শুরু করে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগের সরকার আমদানি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভ রক্ষা এবং বিদেশি ঋণ বাড়ানোর মতো নানা পদক্ষেপ নেয়। তবে তারপরও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
📈 রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সে কিছু স্বস্তি
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে—
- রিজার্ভের পতন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে
- ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়েছে
- প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) বেড়েছে
- আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ঋণপ্রাপ্তি সহজ হয়েছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এসব কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে।
🏦 সরকারি ও বেসরকারি খাতের ঋণ পরিস্থিতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী—
- সরকারি খাতে ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলারে (আগে ছিল ৯২ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন)
- বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়ে হয়েছে ২০ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার (আগে ছিল ১৯ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন)
অর্থাৎ, দুই খাতেই ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
🧠 অর্থনীতিবিদদের সতর্কবার্তা
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিদেশি ঋণ নেওয়া পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এটি প্রয়োজন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন,
👉 “আগে নেওয়া ঋণের অনেক ক্ষেত্রে অপচয় হয়েছে। যদি এই অপচয় বন্ধ না করা যায়, তাহলে ঋণ দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।”
তিনি আরও জানান, বর্তমানে জিডিপির তুলনায় বিদেশি ঋণ এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু বৈদেশিক আয়ের তুলনায় ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ অনেক বেড়েছে।
⚠️ ভবিষ্যতের ঝুঁকি কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—
- ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা
- অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করা
- বৈদেশিক আয় (রপ্তানি ও রেমিট্যান্স) বৃদ্ধি করা
নয়তো ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে দেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

0 Comments